শুভ্র নাথ চৌধূরী : ষাটের দশকের গণআন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেয় বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিবর্তনের কারিগর। আমরা ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছিেলেন।তোফায়েল আহমেদ। তার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছিল ষাটের দশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি এবং পরবর্তীতে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তৎকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার কণ্ঠস্বর কাঁপিয়ে দিয়েছিল শাসকের ভিত। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। সেদিনই ইতিহাসের পাতায় তার নাম চিরতরে খোদাই হয়ে যায় এই একটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, পরের বছর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন তোফায়েল। ঊনসত্তরেই তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যে আসেন। পরের বছরের ২ জুন শেখ মুজিবের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন। স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদ হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি মোট নয় বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচেন ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান দায়িত্বে ছিলেনর তোফায়েল আহমেদ। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক সবমিলিয়ে নয়বার এমপি হয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে—১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন। এসব নির্বাচনে তিনি জনগণের বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১৪-২০১৯ মেয়াদেও তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরবর্তীকালে দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক তোফায়েল স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব করে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন যেমন ছিল সাফল্যের, তেমনই ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক জান্তা তাকে গ্রেফতার করে। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়, রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে তাকে স্থানান্তর করা হয়। তখন দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারাভোগ করেন। সে সময় তার সহকারী ব্যক্তিগত সচিব মিন্টুকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালে তোফায়েল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগেও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে কারাবরণ করতে হয়। পারিবারিক জীবনে তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৪ সালে আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র কন্যা তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী একজন চিকিৎসক। তবে নিজের একমাত্র কন্যার চেয়েও তিনি পরম স্নেহে আগলে রেখেছিলেন তার দত্তক নেওয়া পুত্র মাইনুল হোসেন বিপ্লবকে। বিপ্লব ছিলেন তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার বড় ভাইয়ের সন্তান। বড় ভাইয়ের এই অকালমৃত্যুকে নিজের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দায় মনে করে, এক গভীর অনুশোচনা ও ভালোবাসা থেকে তিনি বিপ্লবকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি স্নেহ করতেন এবং সবখানে নিজের পুত্র হিসেবেই পরিচয় দিতেন। একটি দেশের ইতিহাস তৈরি হয় কিছু মানুষের হাত ধরে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ, যিনি নিজেই ছিলেন ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত দলিল। তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মৃত্যুর দুই ঘণ্টা পর দলটির ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, ‘বিদায়… বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য, বর্ষীয়ান নেতা, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদ… আমরা শোকাহত!’ তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, সোমবার বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ রাখা হবে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে। মঙ্গলবার জন্মভিটা ভোলায় নেওয়া হবে সেখানে বাদ জোহর ভোলা জেলা স্কুল মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
০৯:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:









