ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন : আজ আমার মেজো ভাই, বীর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা এবং চট্টগ্রামের কৃতি ফুটবলার সাইফুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৭
সালের এই দিনে, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামের ষোলশহর রেল স্টেশনের কাছে এক মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় তিনি আহত হন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যারা তার সম্পর্কে অবগত নন, তাদের জন্য কিছু কথা তুলে ধরা জরুরি মনে করছি।
সাইফুল ভাই তার স্কুল জীবন থেকেই একজন অসাধারণ ফুটবলার ও স্পোর্টসম্যান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রথম জাতীয় যুব ফুটবলের রানার্স আপ চট্টগ্রাম একাদশের এবং চট্টগ্রাম প্রথম বিভাগের অন্যতম সেরা সিজিএমসিএল (ইস্পাহানি ক্লাব) এর নিয়মিত খেলোয়াড়। এমনকি তিনি ঢাকার প্রথম বিভাগেও উয়ারী ক্লাবের হয়ে খেলতেন। একজন দুর্দান্ত সাহসী তরুণ হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলাম দেশের যেখানেই খেলতে যেতেন, সেখানেই তার অদম্য ক্রীড়া নৈপুণ্যের কারণে দর্শক মুগ্ধ হতেন এবং তার নাম ক্রীড়াপ্রেমীদের মুখে মুখে ফিরত। চট্টগ্রামের এমন কোনো অলিগলি ছিল না যেখানে তরুণরা সাইফুলকে চিনত না। মানুষের বিপদে সাহায্যের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখতেও এই দুর্দান্ত তরুণ দ্বিধা করতেন না। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আসার পর, সাইফুল ইসলাম মুরাদপুর, ষোলশহর এবং নাসিরাবাদ এলাকায় ছাত্র-তরুণদের নিয়ে ২৬শে মার্চের কিছুদিন আগে থেকেই ডামি রাইফেল ট্রেনিংয়ে অংশ নেন। উল্লেখ্য, আমাদের শহরস্থ মুরাদপুরের বাড়ির খুব কাছেই ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঘাঁটি। ২৪শে মার্চ থেকে সেখানে বাঙালি সেনাদের উপর পাকিস্তানি সেনাদের নজরদারির খবর পাওয়া যাচ্ছিল। এর আগে পাকিস্তানি যুদ্ধ জাহাজে অস্ত্র খালাস হওয়ার খবরে জনগণ সামরিক হামলার আশঙ্কা করছিলেন। এজন্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে নাসিরাবাদ-ষোলশহর শিল্প এলাকাসহ এসব এলাকার জনগণ ক্যান্টনমেন্টগামী বা সংলগ্ন সকল সড়ক কেটে ২৫শে মার্চ সকাল থেকেই ব্যারিকেড দেওয়া শুরু করেন।
২৬শে মার্চ গভীর রাতে ঢাকায় ঘুমন্ত মানুষের উপর পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা, বাঙালি সেনা ও পুলিশদের হত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার খবর পেয়ে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা ভোর হওয়ার আগেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে কিছু সাহসী বাঙালি সেনা অফিসার অন্যান্য বাঙালি সেনাদের সাথে নিয়ে পাকসেনাদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘাঁটির আশপাশের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাড়িতে বসবাসকারী কর্নেল জানজুয়া ও কিছু পাকসেনা অফিসারকে গ্রেফতার বা হত্যা করা হয়। ভোরে আমাদের এলাকায় গোলাগুলির ভয়ংকর শব্দে আমরা জেগে উঠেছিলাম। ভোর থেকেই শুনলাম, সাইফুল ভাই সহ কয়েকজন মাইকযোগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরুর খবর মাইকিং করে প্রচার করছেন। তারা বাঙালি সেনাদের জন্য এলাকাবাসীকে খাবার নিয়ে আসারও আহ্বান জানান। মেজর জিয়া সহ অন্যান্য অফিসারদের আমাদের এলাকায় কর্মস্থল ও আবাসন থাকায় তাদের সাথে সাইফুল ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল।
এই সময় মুরাদপুর ও ষোলশহর এলাকা গোলাগুলি, আর্তনাদ ও হৈচৈ এর শব্দে ভারী হয়ে ওঠে। এ এলাকার মুক্তি পাগল মানুষ যার যা কিছু আছে তা নিয়ে বাঙালি সেনাদের সাথে যোগ দিয়ে পাকসেনাদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন। ২৬শে মার্চ ভোর থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই আমার বড়ো ভাই নজরুল ইসলাম হারুন ও সাইফুল ভাই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের খাদ্য সরবরাহসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। ২৬শে মার্চ সন্ধ্যায় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থেকে চালু হওয়ার পর মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পাকবাহিনীকে সশস্ত্র প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা দেশে প্রথম চট্টগ্রাম থেকে, তাও আবার আমার জন্মস্থান ষোলশহর-মুরাদপুর-নাসিরাবাদ থেকে – এজন্য আমি অবশ্যই গর্বিত। এসব এলাকার জনগণের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ২৬শে মার্চ পাকসেনারা ঢাকার মতো গণহত্যার সুযোগ পায়নি, শহরের দিকে আসতে তাদের সময় লেগেছিল জনগণের এবং তাদের সাথে যোগ দেওয়া বাঙালি সেনাদের প্রতিরোধের মুখে। এর মধ্যে নিরীহ জনগণ শহর ছেড়ে যেতে পেরেছিলেন। এসব এলাকায় অনেক মানুষ এই যুদ্ধের শুরুতেই জীবন দিয়েছিলেন।
২৬শে মার্চ যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের উপর পাকবাহিনীর প্রবল আক্রমণের কারণে বড় ভাই নজরুল ইসলাম এবং মেজো ভাই সাইফুল ইসলাম কয়েকদিন পর বোয়ালখালীর আমাদের দাদার বাড়িতে চলে যান, যেখানে আমরা সপরিবারে ইতিমধ্যে শহর ছেড়ে এসেছিলাম।
সেখানে তারা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। আর আমার পিতা দিনরাত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেন। মরহুম বীর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ভাইয়ের সেই সময়ের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে বোয়ালখালীর কধুরখীলে মুক্তি প্রিয় মানুষের উপর নিপীড়নকারী সশস্ত্র রাজাকারদের উপর বোমা হামলা করতে গিয়েছিলেন তিনি এবং আরেক দুঃসাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ এখলাস। দুজনেই তখন নবম বা দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। সেই দিন বোমাটি রাজাকারদের উপর না পড়ে পাশের খালে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এখলাস সেই ঘটনায় সাথে সাথে গ্রেপ্তার হয়ে যান। সাইফুল ভাই প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ফুটবলার হওয়ায় তিনি দ্রুতগতিতে দৌড়ে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হন। তবে রাজাকার ও পাকসেনাদের নির্মম অত্যাচারে সেই রাতেই শহীদ হয়েছিলেন এখলাস। স্বাধীনতার পরে বোয়ালখালীতে ইকবাল পার্কের নাম পরিবর্তন করে শহীদ এখলাস পার্ক রাখা হয়েছিল। আর বোয়ালখালীর এয়াকুবদন্ডী এলাকায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে।
সাইফুল ভাই, বড় ভাই নজরুল ইসলাম ওরফে সৈয়দ হারুন এবং আমাদের পিতা ডা: নুরুল হুদা নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের পিতা ডা: নুরুল হুদা চট্টগ্রামে মেডিকেল ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পাক-ভারতের স্বাধীনতার পরে জিলা ছাত্রলীগের নেতা ও মেডিকেল স্টুডেন্ট লীগের সভাপতি ছিলেন। কাজেই চিকিৎসক হিসেবে ছাড়াও রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তার সুপরিচিতি ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাকে একজন জনপ্রিয় চিকিৎসক হিসেবে হত্যার উদ্দেশ্যে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। একবার তার মুরাদপুরের বাড়িতে পাকসেনা ও বিহারি রেফিউজি রাজাকাররা হানা দিলে অল্পের জন্য বেঁচে যান। এরপরও তিনি বোয়ালখালীতে তার কর্মকান্ড অব্যাহত রাখেন এবং এক পর্যায়ে তিনিও সেখানে পাকহানাদার এবং রাজাকারদের টার্গেটে পড়ে যান। যার কারণে তাকে আবারও বোয়ালখালী থেকেও সরে আসতে হয়েছিল চট্টগ্রাম শহরের চাক্তাই এলাকায় অবস্থান নেওয়ার জন্য। সেখান থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দিনরাত চিকিৎসা সেবা ও নানাভাবে সহযোগিতা করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
মরহুম সাইফুল ইসলাম স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। কিছুদিন ছাত্র ইউনিয়নের সাথেও কাজ করেছিলেন।
আর একটি বিষয় হয়তো অনেকেই জানেন না। সুগন্ধা আবাসিক এলাকা চট্টগ্রামের একটি অন্যতম দামী অভিজাত আবাসিক এলাকা। আবাসিক এলাকা হওয়ার আগে, স্বাধীনতার আগে থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত এখানে শহরের আবর্জনা ফেলা হতো এবং পোড়ানো হতো। এসবের দুর্গন্ধ পার্শ্ববর্তী এলাকার এমনকি নগরবাসীর জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, একসময় সহ্যের বাইরে চলে আসে। কিন্তু কারো কোনো প্রতিবাদ নেই, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর কোনো দায়-দায়িত্ব বা সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। এই প্রেক্ষিতে ১৯৭৫/৭৬ সালে সাইফুল ইসলাম এগিয়ে এসে তার সাথী ও মুরাদপুর-কাতালগঞ্জ-শুলকবহর এলাকাবাসীদের নিয়ে প্রতিবাদ এবং ট্রাক থেকে আবর্জনা ফেলতে বাধা প্রদান করতে থাকেন। একদিন বাধা দেওয়ার সময় তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে স্থানীয় জনসাধারণের প্রবল প্রতিবাদের মুখে সেটা ব্যর্থ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তার নেতৃত্বে তরুণদের এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা কঠোর প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি) বাধ্য হয় ওই স্থানে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে। পরবর্তীতে এই এলাকাতেই একটি বিলাসবহুল আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে যেটি এখন সুগন্ধা আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে এই সফল সংগ্রামটি করেছিলেন।
একসময় বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে বোয়ালখালী ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে তাকে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার স্মরণে চট্টগ্রাম শহরে ও বোয়ালখালীতে অনেকবার ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের হামজারবাগ প্রাইমারি, নাসিরাবাদ সরকারি ও রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং সিটি কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি।
চট্টগ্রামের শতাব্দী গোষ্ঠী একটি অরাজনৈতিক ও ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও সমাজকল্যাণমূলক সংগঠন যা ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। এর জন্মলগ্ন থেকেই মরহুম সাইফুলের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট ও ২য় বিভাগে এটির ফুটবল টিম আছে।
পরম করুণাময়ের কাছে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
( ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন)




















